খাসোগি হত্যার এক বছর পর…

0
47

সৌদি আরবের নাগরিকরা মার খাচ্ছে। সৌদি আরবের সেনা ও তাদের মিত্ররা হত্যার শিকার হচ্ছেন বা আত্মসমর্পণ করছেন সৌদি সীমান্তের ভেতরে নাজরান শহরে- হুথিদের কাছ থেকে প্রকাশিত এমন ভিডিও রাজকীয় সৌদি আরবের জন্য বিপর্যয়কর আঘাত। অথচ এ দেশটি কিনা ক্রমাগত ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে।

যদি নিজের ভূখণ্ডের ভেতরেই নিজেদের সশস্ত্র বাহিনীকে সুরক্ষা দিতে না পারে সৌদি আরব, তবে প্রায় দু’সপ্তাহ আগে আবকাইক ও খুরাইসে দুটি তেল শোধনাগারে বড় ধরনের বিপর্যয়কর হামলাকে কেন্দ্র করে ইরানকে ছোট করে দেশটির বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার হুমকি দিয়ে সময় নষ্ট করার অর্থ কী?

এটি তো ওই সৌদি আরব, যা কিনা লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিকে অপহরণ করেছিল, ইয়েমেনে হাজারও বেসামরিক নাগরিকের ওপর বোমাবর্ষণ করেছিল এবং স্বাধীন রাষ্ট্র কাতারকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চেয়েছিল। এক বছর আগে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটের ভেতরে জামাল খাসোগিকে টুকরো টুকরো করার কথা উল্লেখ নাইবা করলাম। ভিন্নমতাবলম্বী সাংবাদিক খাসোগিকে হত্যার পর তার শরীরের টুকরোগুলোকে গোপনে কবর দেয়া হয়, যার জন্য মোহাম্মদ বিন সালমান (সম্ভবত সৌদি আরবের ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে যুবরাজ) এখন জাতীয় দায় স্বীকার (অবশ্য ব্যক্তিগতভাবে নয়) করছেন।

বাদশাহ সালমানের ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী সম্প্রতি জেদ্দায় হত্যার শিকার হয়েছেন এক ‘বন্ধু’র হাতে, যা আমাদের বলছে দেশটির অভ্যন্তরীণ গোলযোগের কেবল আরেকটি ঐতিহাসিক নোট নিতে। আমেরিকানরা এখন কি উদ্ভট এই রাজতন্ত্রের জন্য ভাড়াটে সেনা হিসেবে খাটতে যাচ্ছে- এমন প্রশ্ন কি এখন করা হবে?

স্পষ্টত, সৌদি আরবের নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের সহকারীদের নিয়ে জড়বুদ্ধি হয়ে আছে। তারা তেমনই আশাহত হয়ে আছে, যেমন তারা সবসময় ছিল। স্মরণ করুন, কীভাবে ১৯৯০ সালে কুয়েতে সাদ্দাম হোসেনের সামরিক আগ্রাসনের পর তার কাছ থেকে নিজেদের সুরক্ষিত করতে পারেনি সৌদি? ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৌদি আরবকে ‘রক্ষা’ করার জন্য আন্তর্জাতিক সেনাবাহিনীর অভিষেক উৎসব হয়েছিল।

মার্কিন কলামিস্ট নিকোলাস ক্রিস্টফের অমর শব্দমালা বিবেচনায় নিয়ে ইরানিরা এখন এ সিদ্ধান্তে আসতে পারেন- ডোনাল্ড ট্রাম্প হচ্ছেন ‘সব বাচ্চা খরগোশের মা’। কিন্তু এটি এখন মোটামুটি স্পষ্ট যে, ইরান পারমাণবিক চুক্তির আওতায় মার্কিন প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার ট্রাম্পের সিদ্ধান্তটি বড় ধরনের একটি বিপর্যয়।

তিনি সম্ভবত এখন এমন একটি কলুষিত রাজতন্ত্রের পক্ষাবলম্বন করবেন, যে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের হুমকি দিচ্ছে সৌদির বড় তেল শোধনাগারে তেহরানের (হুথি?) হামলার কারণে। কিন্তু কী দিয়ে তিনি পক্ষে দাঁড়াবেন? তিনি কি ইরানে বোমা হামলা করবেন এবং তারপর তেহরানকে বলবেন পাল্টা হামলা যেন না করা হয়? যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজগুলোর দিকে? সৌদি আরবে অবস্থানকারী মার্কিন সেনাদের দিকে?

বস্তুত, এসব শোচনীয় বীরত্বগাথা শুরু হচ্ছে যতটা না ‘মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ’ দেখাতে, তার চেয়ে বেশি ‘পারস্য উপসাগরে জট পাকানো’ বোঝাতে। আমরা ইরানকে আরও গভীরভাবে বিবেচনা করতে যাচ্ছি। কিন্তু এটি কি এমন একটি সময়ে করা যাবে, যখন ইরানের প্রধান বিরোধী একটি রাজতন্ত্র ‘সাপটির (ইরান) মাথা কেটে ফেলার’ কথা বলছে- ভাঁড়ের মতো আচরণ করছে।

এটিই যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি আরব সম্পর্কের চূড়ান্ত সংকট- তা এখনই বলা বেশি তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে। আমরা জানি কীভাবে সৌদি আরবের টাকা গোটা বিশ্বের নৈতিকতাকে নীরব করে দিয়েছে দরিদ্র জামাল খাসোগিকে খণ্ডবিখণ্ড করার ঘটনায়। তখন একেবারে আমাদের ডাউনিং স্ট্রিট ভাঁড়ও সৌদির পক্ষ নিয়েছে। ব্রিটেনের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্যের জন্য অপেক্ষা করারই সুযোগ নেই। কিন্তু মোটামুটি শিগগিরই মার্কিনিরা বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন সেটাই করতে যাচ্ছে, যেটা আইসেনহায়ার করেছিলেন, যখন ১৯৫৬ সালের সুয়েজ যুদ্ধের সময় তাকে ডুলসে পাঠানো হয়েছিল এডেনকে সতর্ক করার জন্য।

ইতিমধ্যে ‘চালিয়ে যান’ বীরত্বগাথার পরবর্তী পর্ব দেখার জন্য কোমর বেঁধে তৈরি হোন। সৌদির আরেকটি উদ্ধত গর্জন কি দেখা যাবে ইরানের বেলায়? আরেকটি তেলবাহী জাহাজ কি আটক করে নেয়া হবে বন্দর আব্বাসে? আরও অনেক ড্রোন- অন্তত ৩০টি একই সময়ে কি উড়ে আসবে সৌদি সীমান্তের অনেক ভেতরে? নাকি অনেক বোমা পড়বে বিয়ে অনুষ্ঠানে বা বন্দিদের শরীরে ইয়েমেনের বালু প্রান্তরে?

আমি পরেরটিতে আস্থা রাখতে চাই। হতে পারে পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলোর একটিকে ধ্বংসের আরেকটি প্রচেষ্টা নেয়া হবে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশগুলোর একটি কর্তৃক।

লন্ডনের দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট থেকে অনুবাদ : সাইফুল ইসলাম, রবার্ট ফিস্ক : ব্রিটিশ সাংবাদিক, মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here