পানির দরে ইলিশ বিক্রি, বিপাকে জেলেরা !!

0
118

ধরা ও বিক্রি নিষেধাজ্ঞার কয়েক ঘণ্টা আগে শেষ মুহূর্তে ধরা ইলিশ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন উপকূলের জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা। মঙ্গলবার রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে ইলিশ ধরা ও বিক্রি নিষিদ্ধ থাকায় বুধবার সন্ধ্যা থেকেই ব্যবসায়ীরা পানির দরে ইলিশ বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন।

বরিশাল ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপকূলে ফিশারিঘাটে ২০০-৩৫০ টাকা কেজিতে ইলিশ বিক্রি করতে দেখা গেছে। কোথাও কোথাও আরও কম দামে, এমনকি বিনামূল্যেও ইলিশ ছেড়ে দিতে দেখা গেছে। কেউ কেউ বরফ দিয়ে ইলিশ লুকিয়ে ফেলেছেন। বুধবার থেকে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

জরিমানাও গুনতে হয়েছে অনেক মৎস্য ব্যবসায়ীকে। বিদ্যমান এ অবস্থায় আগামী মৌসুমে ইলিশ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির পর অন্তত ৩ দিন ইলিশ পরিবহন ও বিক্রির অনুমতি দেয়ার দাবি করেছেন মৎস্য ব্যবসায়ীরা। তবে মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা অবশ্য এটি মানতে নারাজ। তারা বলছেন, ‘সেরকম কিছু হলে এর অপব্যবহার হবে। বাজারজাত এবং পরিবহনের দোহাই দিয়ে প্রজনন মৌসুমে ইলিশ শিকার করবেন জেলেরা।’

বরিশাল ব্যুরো জানায়, মঙ্গলবার রাত ১২টা ১ মিনিট থেকেই ২২ দিনের জন্য ইলিশ শিকার ও পরিবহন-বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে নেয়া এ উদ্যোগ প্রশংসিত হলেও একটি বিষয় নিয়ে কয়েক বছর ধরেই চলছে জটিলতা। নিষেধাজ্ঞার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জেলেরা ইলিশ শিকারের চেষ্টা করেন। কেননা নিষেধাজ্ঞা চলাকালে পরিবার প্রতি সরকারি সহায়তা বাবদ ৩০ কেজি চাল খুবই কম।

যেসব জেলে ইলিশ ধরার জন্য সাগরে যান তাদের পক্ষে ঘড়ি ধরে নির্ধারিত সময়ে তীরে আসা হয়ে ওঠে না। তাছাড়া ঘড়ি ধরে তীরে এলেও ধরা মাছ বিক্রি করা নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। কথা হয় পাথরঘাটার জেলে কবির ব্যাপারীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘৯ অক্টোবর থেকে ইলিশ শিকার বন্ধ। কিন্তু ৮ অক্টোবর রাত পর্যন্ত যেসব ইলিশ ধরা হয় তা নিয়ে চরম বিপদে পড়তে হয় আমাদের। এসব ইলিশ যেমন কোথাও পাঠানো যায় না তেমনি বাজারেও বিক্রি করা যায় না।’

বরগুনা জেলা ট্রলার মালিক অ্যাসোসিয়েশেনের সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগের দিন মঙ্গলবার বিকালে কয়েকশ’ ট্রলার সাগর থেকে ইলিশ নিয়ে আসে। প্রতি ট্রলারে দেড় থেকে ২শ’ মণ করে ইলিশ ছিল। শেষ মুহূর্তে আসা এ ইলিশ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন জেলে-ব্যবসায়ীরা। একপর্যায়ে কম দামে ইলিশ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন জেলেরা। সোমবার যে ইলিশের কেজি ছিল ৮শ’ থেকে হাজার টাকা, মঙ্গলবার রাতে তা নেমে আসে ৩শ’ থেকে সাড়ে ৩শ’ টাকায়। মঙ্গলবার রাতভর এভাবেই কেনাবেচা হয় ইলিশের।

একাধিক সূত্র যুগান্তরকে বলেছেন, ‘বিক্রি না হওয়া বিপুল পরিমাণ ইলিশ মজুদ করে রেখেছেন এক শ্রেণির ব্যবসায়ী। নিষেধাজ্ঞা ওঠার পর এগুলো বাজারে ছাড়া হবে।’ পটুয়াখালীর আলীপুর মাছের মোকামের ব্যবসায়ী মনি ফিশের মালিক আ. জলিল বলেন, ‘মঙ্গলবার শ’খানেক ট্রলার ইলিশ নিয়ে আসে আলিপুর বন্দরে। বিক্রির ব্যবস্থা না থাকায় এ ইলিশের দাম সাড়ে তিনশ’ টাকায় নেমে আসে মুহূর্তেই। অনেক ট্রলার পরে আর আলিপুর না এসে বরিশালসহ বিভিন্ন বড় মোকামে সংরক্ষণের উদ্দেশে পাঠিয়ে দেন ব্যবসায়ীরা।’

পিরোজপুরের পাড়েরহাট, ভোলার লালমোহন এবং মনপুরা চরফ্যাশনসহ অন্যান্য ইলিশের মোকাম থেকেও একই খবর মিলেছে। সর্বত্রই ইলিশ নিয়ে দুর্ভোগে পড়েন জেলেরা। বরিশাল মৎস্য আড়তদার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক নীরব হোসেন টুটুল বলেন, ‘ইলিশের দাম পড়ে যাওয়ায় মৎস্য ব্যবসায়ীদের চোখে ছিল পানি।

পরিবহন ও বিক্রির জন্য ৩ দিন সময় পেলেই হতো। প্রজনন মৌসুমে ইলিশ শিকার বন্ধ থাকুক এটা আমরাও চাই। তবে ধরা পড়া ইলিশ বাজারজাতের সুযোগ দিলে লোকসান হতো না।’ বরিশালের মৎস্য কর্মকর্তা (ইলিশ) ড. বিমল চন্দ্র দাস বলেন, ‘আইনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে জেলে এবং মৎস্য ব্যবসায়ীরা সরকারের কাছে এ দাবি জানালে সরকার অবশ্যই ভাববে। তবে আমাদের পক্ষে এ ধরনের কোনো সুযোগ দেয়ার আইনগত অধিকার নেই।’

ব্যবসায়ীকে জরিমানা : বুধবার ভোরে বরিশালে ইলিশের মোকামে অভিযান চালিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় পোর্ট রোড ইলিশ মোকাম থেকে ৪০ কেজি ইলিশ উদ্ধার করা হয়। ইলিশ বিক্রির কারণে জাকির হোসেন জাহিদ নামের এক ব্যবসায়ীকে ৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে। বরিশাল মৎস্য কর্মকর্তা (ইলিশ) ড. বিমল চন্দ্র দাস বলেন, এছাড়া আরও একাধিক টিম নদীতে রয়েছে।

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, চট্টগ্রামের ফিশারি ঘাটেও মঙ্গলবার রাতে পানির দরে বিক্রি হয় ইলিশ। ভোররাত পর্যন্ত ৩০০-৩৫০ টাকা কেজি দরে ইলিশ বিক্রি হয়। শেষ সময়ে ইলিশের দাম অবশ্য ৫০০ টাকায় ওঠে। মোবাইলের মাধ্যমে সস্তায় ইলিশ বিক্রির বিষয়টি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল, ট্যাক্সি করে হাজার হাজার ক্রেতা ফিশারিঘাটে ইলিশের জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েন। রাত বাড়ার সঙ্গে ক্রেতার সংখ্যাও বাড়তে থাকে ঘাটগুলোতে। একেকজন ১০-২০ কেজি করে ইলিশ ক্রয় করে নিয়ে যান।

চমেক হাসপাতালের কর্মকর্তা জাকির আহমদ জানান, আমরা দু’জন মিলে এক মণ কিনেছি ৩শ’ টাকা কেজি দরে। স্বাভাবিক সময়ে এ মাছের কেজি বিক্রি হয়েছে এক থেকে দেড় হাজার টাকায়। এদিকে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ইলিশ ধরা ও বিক্রি করার অপরাধে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে। এলাকা ভাগ করে ১১ ম্যাজিস্ট্রেটকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাজিব হোসেন যুগান্তরকে বলেন, আইন অমান্য করে কেউ যাতে ইলিশ ধরতে না পারে সে জন্য ১১ ম্যাজিস্ট্রেট তদারকি করবেন। তারা কাজও শুরু করে দিয়েছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here