পিছু হটছেন ট্রাম্প, এগিয়ে আসছেন ম্যাক্রোঁ

এক বছর আগেও কেউ ভাবতে পারেননি যে, মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা কূটনীতিতে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিতে পরিণত হবেন। অথচ এখন সেটি হতে চলেছে।

অধিকৃত জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বীকৃতি প্রদান ও তার মুসলিমবিদ্বেষী বৈরী টুইট এবং পররাষ্ট্র দফতরের স্টাফের সংখ্যা হ্রাসে কূটনীতি থেকে তার দেশের পিছু হটার আভাস বলে মনে করা হচ্ছে।

এতে তাদের জন্য জায়গা করে দেয়া হয়েছে যারা বিশ্বমঞ্চে নিজেদের উপস্থিতি সম্প্রসারণ করতে চান। এমন ব্যক্তিদেরই একজন হলেন ম্যাক্রোঁ। মধ্যপ্রাচ্যে তার ভূমিকা বেশ দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।

কেননা ব্রিটেন ও জার্মানি তাদের নিজেদের ঘরের রাজনীতি নিয়েই এখন বেশি ব্যস্ত রয়েছে। ট্রাম্প জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের দুই দিন আগে তার সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন এবং ট্রাম্পকে জানান যে,

তার এই পদক্ষেপ নিয়ে ফ্রান্স বেশ ‘ঝামেলায়’ রয়েছে। গত নভেম্বরে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি বাহ্যত সৌদি চাপে পদত্যাগ করার পর ম্যাক্রোঁ ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করেন। উপসাহারার অভিবাসীরা লিবিয়ায় পৌঁছানোর আগেই তাদের আগমন ঠেকানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এখন ম্যাক্রোঁ সিরিয়ার যুদ্ধোত্তর নীতি প্রণয়নে সহায়তা করছে।

এর বিপরীতে সিরিয়ায় নীতি প্রণয়নে অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্র মোটেই আগ্রহী নয় বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে রাশিয়ার জন্য সেখানে বড় ধরনের ভূমিকা পালনের সুযোগ উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। ম্যাক্রোঁর সাথে আবু ধাবি ও রিয়াদ সফরকারী ইসলাম সম্পর্কিত বিশেষজ্ঞ ও ফ্রান্সের সায়েন্সেস পো’র অধ্যাপক গিলস কেপেল বলেন, ‘পাঁচ বছর আগের ঘটনা হলে সৌদিদের কবল থেকে হারিরিকে উদ্ধারে অবশ্য মার্কিন কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ অবশ্য করা হতো।’

কেপেলের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন সম্পর্কে কিছু বলা যাবে না। প্রেসিডেন্ট সকালে এক কথা টুইট করেন আর বিকেলে বলেন অন্য কথা। সাবেক কূটনীতিকেরাও ট্রাম্প প্রশাসন সম্পর্কে অনুরূপ মনোভাব পোষণ করেন।

অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক রাইয়ান ক্রোকার বলেন, ‘এটি স্পষ্ট অতীতে যুক্তরাষ্ট্র লেবানন প্রশ্নে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করেছে। অথচ ওয়াশিংটনকে একটি কথা বলা ছাড়াই সৌদি আরব হারিরিকে দিয়ে তার পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছে। রাইয়ান ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্টর আমলে মধ্যপ্রাচ্যে কূটনীতিকের দায়িত্ব পালন করেন।

তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এসব ঘটনায় সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ দূরে সরে যাওয়ার বিষয়টি ফুটে উঠেছে। এমনকি সৌদি আরবের মতো মিত্র দেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূত নেই। ওই অঞ্চলের অন্য ছয়টি দেশের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন গত সপ্তাহে ভিয়েনার হোটেল ব্রিস্টলে বক্তৃতাকালে দাবি করেন, এসব কূটনৈতিক পদ খালি থাকার কারণে তার দফতরের কোনো ক্ষতি হচ্ছে না।

ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের ঘোরতর সমর্থক এবং সৌদিসহ কয়েকটি সুন্নি দেশকেও তিনি সমর্থন জানাচ্ছেন। আর ইরানকে বিচ্ছিন্ন করতে আর আইএসকে ধ্বংস করতে চাচ্ছেন। ট্রাম্প অবশ্য মধ্যপ্রাচ্যের ঝুঁকিপূর্ণ রাজনীতি থেকে দূর সরে থাকারও চেষ্টা করছেন। এর বিপরীতে ফ্রান্স সরকার মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানের ক্ষেত্রে ভূমিকা পালনে কোনো সঙ্কোচ প্রকাশ করছে না।

লন্ডনের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের মধ্যপ্রাচ্য নিরাপত্তাবিষয়ক ফেলো এমিল হোকাইম বলেন, ওই অঞ্চলে ‘বিনিয়োগ করার মতো মূলধন’ ফ্রান্সের রয়েছে। অবশ্য মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় ফ্রান্সের গভীর সংশ্লিষ্টতা নতুন কিছু নয়।

আলজেরিয়ায় ১৩০ বছর ধরে উপনিবেশ গড়ে তুলেছিল দেশটি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানি সাম্রাজ্যের এসব অঞ্চল দখল এবং ভেঙে খণ্ডবিখণ্ড করার ষড়যন্ত্রকারী শক্তি ছিল এই ফ্রান্স ও ব্রিটেন। সম্প্রতি ফ্রান্স সিরিয়ায় বাশারের বিরুদ্ধে সুন্নি আরব দেশগুলোর সমর্থন দিতে অস্বীকার করে।

ফ্রান্সের সমরাস্ত্রের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ রফতানি বাজার হচ্ছে যথাক্রমে সৌদি আরব, মিসর ও কাতার। সম্প্রতি কাতার সফরকালে ম্যাক্রোঁ দেশটির কাছে ১৩০ কোটি ডলারের যুদ্ধবিমান বিক্রির কথা ঘোষণা করেন। গত বুধবার ম্যাক্রোঁ আলজেরিয়ায় ছিলেন। দেশটির প্রেসিডেন্টের অনিশ্চিত স্বাস্থ্যের প্রেক্ষাপটে প্যারিস-আলজিয়ার্স সম্পর্ক শক্তিশালী করতে তিনি সেখানে যান।

মধ্যপ্রাচ্যের সাথে ম্যাক্রোঁর সংযোগ তেমন একটি ছিল না কিন্তু তিনি এমন একটি টিম গঠন করেছেন যারা ওই অঞ্চল সম্পর্কে অত্যন্ত গভীর জ্ঞান রাখেন। তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিন-ইয়েভস ড্রিয়ান একজন সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরব সামরিক বাহিনীর সাথে যার ভালো যোগাযোগ রয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অন্য সিনিয়র কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছে একজন সাবেক রাষ্ট্রদূত যিনি সৌদি আরব ও ইরানে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তবে কয়েকজন কূটনীতিক বলেন, ফ্রান্স যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প হতে পারে না। দেশটি একটি ছোট দেশ। ওয়াশিংটনের মতো কোনো চুক্তির গ্যারান্টার হওয়ার ক্ষমতাও ফ্রান্সের নেই। তবে ম্যাক্রোঁর ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও কৌশল ট্রাম্পের চেয়ে বেশ ভিন্ন।

ব্রাসেলস-ভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকাবিষয়ক পরিচালক জুস্ট হিল্টারম্যান বলেন, ‘ট্রাম্পের আগে আমরা আমেরিকার শতাব্দীতে ছিলাম। আমেরিকা তার কৌশল বাস্তবায়নে তার ব্রিটিশ ও ফরাসি মিত্রদেরকে ব্যবহার করত। কিন্তু এখন পরিস্থিতি আর সে রকম নেই। কূটনীতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের কোনো আগ্রহ নেই।’

লেবানন পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে ম্যাক্রোঁর ভূমিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যে তার সংশ্লিষ্টতা স্পষ্ট প্রকাশ পেয়েছে। ল্যুভরের শাখা উদ্বোধন করতে সম্প্রতি তিনি আবু ধাবি সফর করেন। তিনি রিয়াদে যেয়ে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মাদ বিন সালমানের সাথেও কথা বলেছেন লেবানন নিয়ে। হারিরি দেশে ফেরার আগে সৌদি থেকে প্যারিসে আসেন।

Leave a Reply