দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের ডিআইজি-এসপি পরিচয়ে কোটি কোটি টাকা প্রতারণার দায়ে ফখরুদ্দিন মোহাম্মদ আজাদ নামে বরখাস্তকৃত এসআইকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এসময় তার প্রধান সহযোগী গাড়িচালক রুবেল সর্দারকেও গ্রেফতার করা হয়।

কুমিল্লার বুড়িচং থানার দেবপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক মো. সাজ্জাদ হোসেনের নেতৃত্বে কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশের সহায়তায় যৌথ টিম অভিযান চালিয়ে ঢাকার খিলগাঁও এলাকার একটি বাসা থেকে তাদের গ্রেফতার করে।

এ সময় উদ্ধার করা হয় পুলিশের পোশাক, ব্যাজ, পুলিশের স্টিকারযুক্ত প্রাইভেটকার, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সিল-স্বাক্ষর সম্বলিত ভুয়া নিয়োগপত্রসহ বিপুল পরিমাণ সরঞ্জামাদি।

মঙ্গলবার দুপুরে জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান কুমিল্লার পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার বাকুই-হরিরচর গ্রামের মৃত আবদুল হামিদের ছেলে ফখরুদ্দিন মোহাম্মদ আজাদ ১৯৯১ সালে পুলিশের এসআই পদে যোগদান করেন। শিক্ষানবিশ থাকাবস্থায় প্রতারণাপূর্বক ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা গ্রহণের দায়ে চাকরি থেকে বরখাস্ত হয়।

২০০০ সালে ডিবি পরিচয়ে রাজধানীতে ছিনতাইকালে তৎকালীন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ডিবির হাতে গ্রেফতার হয়ে সাত মাস কারাভোগ করেন ফখরুদ্দিন মোহাম্মদ আজাদ। এরপর ২০০৫ সালে পুলিশ বাহিনী থেকে তাকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা হয়।

পরবর্তীতে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ফখরুদ্দিন মোহাম্মদ আজাদ কুমিল্লা, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ, সেনাবাহিনীসহ সরকারের বিভিন্ন দফতরে নিয়োগ, বদলী, দেশ বিদেশে প্রেরণের বিভিন্ন ভুয়া সনদপত্র, মামলা থেকে অব্যাহতি, মামলায় জড়ানোসহ গ্রেফতার ও বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখিয়ে গাড়ি, জায়গা সম্পত্তিসহ লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়।

পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম জানান, ঢাকার খিলগাঁও আবাসিক এলাকার সি ব্লকের ৩৬৪নং বিলাস বহুল বাসা থেকে প্রায় ১৯ বছর পর সোমবার রাতে তাকে আবারো গ্রেফতার করা হয়। তিনি দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে বিভিন্ন প্রতারণা চালিয়ে আসছে নির্বিঘ্নে। তার গ্রেফতারের পর মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত কয়েক কোটি টাকার প্রতারণার শিকার ১১জন ভুক্তভোগী পুলিশের সাথে যোগাযোগ করে।

তিনি জানান, প্রতারণায় প্রধান সহযোগী তার গাড়িচালক রুবেল সর্দারকেও আটক করা হয়েছে।একজন ভুক্তভোগী জাতিসংঘের কর্মকর্তা মো. জয়নাল আবেদীন জানান, ৩ বছর পূর্বে তার স্ত্রী ২ সন্তানের জননী শাহনাজকে প্রতারণা পূর্বক ফুঁসলিয়ে কৌশলে নিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ না ঘটিয়ে অবৈধভাবে ঘর-সংসার করছে।

অপরদিকে পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম বলেন, এক মাস আগে অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক সাইদুল ইসলাম একটি অভিযোগ করেন।তার ছেলেকে পুলিশের চাকরি দেয়ার কথা বলে ১১ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় ফখরুদ্দিন।

তারপর কুমিল্লা জেলার বুড়িচং থানাধীন দেবপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক মো. সাজ্জাদ হোসেনের নেতৃত্বে জেলা ডিবি পুলিশের একটি দল অভিযান চালিয়ে প্রতারক ফখরুদ্দিনকে ঢাকার খিলগাঁও থেকে আটক করে।

আটক হওয়ার পর আরও অন্তত ১০-১২ জন ভুক্তভোগী পুলিশ কার্যালয়ে এসেছেন ফখরুদ্দিনের বিষয়ে অভিযোগ নিয়ে। যার মধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ব্যাংকার রেজা, আজম, আনোয়ার, শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া, সালমান তালিব, গোলাম আজম, মাইনুল, পারভেজ , মিজানসহ আরও অনেকে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত রেজা জানান, তার নতুন কেনা প্রাইভেটকারটি প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেয় ফখরুদ্দিন।সংবাদ সম্মেলনে আরেক অভিযোগকারী আনোয়ার জানান, দোকান দেয়ার নাম করে ২ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় ফখরুদ্দিন।এ ছাড়াও সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত আরেকজন জানান, ঋণ নিয়ে ৪০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন ফখরুদ্দিন। এমন অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে ফখরুদ্দিনের বিরুদ্ধে।

পুলিশ সূত্র আরও জানায় এ প্রতারককে গ্রেফতারের পর তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় পুলিশের বিভিন্ন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বদলির আদেশের নাম সম্বলিত কপি, পুলিশের পোশাক পরা একাধিক ছবি, প্রতারণা কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন ব্যাংকের একাধিক চেকবইসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ইস্যুকৃত ভুয়া কাগজপত্র।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন পদোন্নতিপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার মো.আবদুল্লাহ আল মামুন, মোহাম্মদ শাখাওয়াৎ হোসেন,অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) আজিম উল আহসান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) তানভীর সালেহীন ইমন, অভিযান পরিচালনাকারী পুলিশ পরিদর্শক মো. সাজ্জাদ হোসেনসহ জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here